বিএনপি ও আওয়ামী লীগের গ্যাঁড়াকল

বিএনপি ও আওয়ামী লীগের গ্যাঁড়াকল

রাজনীতি এমন এক বিষয়, যে সম্পর্কে সংশ্লিষ্টরা মুখ বন্ধ করে রাখতে পারেন না। কৌতুক করে কেউ কেউ বলেন, ‘মুখ চুলকানি’। বিএনপি নেতারা বলছেন, নির্বাচন কমিশনে কাদের রাখা উচিত, সেটা নির্ধারণে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করার জন্য গঠিত সার্চ কমিটির বিষয়ে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। এখন তাদের একটিই দাবি, নির্বাচনকালীন সরকার। তবে আপাতত তারা ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ বলছেন না, ‘নিরপেক্ষ সরকার’ও বলছেন না।

‘সুশীল সমাজের’ তরফে একজন দাবি করেছেন, ‘নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে গণশুনানি করতে হবে।’ এই সমাজের সামনের সারিতে যারা, তাদের কাউকে কাউকে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি আইন জারির পর গঠিত বিশেষ ধরনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দেখা গেছে খুব সক্রিয়। কয়েকদিন আগে একটি বৈঠকে এই সক্রিয়দের কয়েকজনকে দেখেছি। তাদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, জরুরি আইনের সময় গঠিত নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছিল কি না। ওই সময়ে একাধিক দৈনিক সংবাদপত্র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমর্থক হিসেবে কাজ করেছে। একটি পত্রিকার শিরোনাম ছিল, ‘হাসিনা-খালেদাকে যেতেই হবে’। তাদের দাবি ছিল এই দুই নেতাকেই রাজনীতি থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দূর করে দিক। বাংলাদেশ টেলিভিশন ছিল পুরাপুরি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিয়ন্ত্রণে। বাংলাদেশ বেতারও সরকারের নিয়ন্ত্রণে। এ দুটি গণমাধ্যমকে নিরপেক্ষভাবে পরিচালনার কথা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভাবেনি। কেন এমনটি হতে পেরেছিল?

২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন বিচারপতি এম এ আজিজ। রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদ নিজেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হিসেবে ঘোষণা করে একটি ‘সরকার’ গঠন করেছিলেন। আওয়ামী লীগ বলেছিল, নিজেদের নিরপেক্ষ প্রমাণ করুন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদ যে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছিলেন তার চারজন সদস্য কয়েকদিনের মধ্যে পদত্যাগ করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, ইয়াজউদ্দিন আহমদ আদৌ নিরপেক্ষ নন। বরং কাজ করছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর জন্য।

পড়ুনঃ-  ছাত্রনেতারা কেন অন্যের বউ উদ্ধারে ব্যস্ত?

২০০৫ সালে বিএনপি বিচারপতি এম এ আজিজকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করেছিল। এই কমিশন যে ভোটার তালিকা প্রণয়ন করেছিল তাতে এক কোটিরও বেশি ভূয়া ভোটার ছিল,এটা সবমহলে স্বীকৃত। বিএনপি এখন দাবি করছে, শেখ হাসিনার সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। এরপর যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে তারাই নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করবে এবং তারা নির্বাচন পরিচালনা করবে। আওয়ামী লীগ কিংবা তার মিত্ররা এটা মানবে না। তাদের এটা মানতে বাধ্য করা যেতে পারে যদি প্রবল রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে ওঠে। আওয়ামী ১৯৯৬ সালে এ ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলতে পেরেছিল। ২০০৬ সালেও এটা তারা করতে পারে। তারা সফল হয়। বিএনপি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে নিজেদের টার্মে অনুষ্ঠিত করতে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করে। এ জন্য ২০১২-২০১৩ সালে শত শত হরতাল করেছে। তাদের সঙ্গে ছিল জামায়াতে ইসলামী। এ আন্দোলন ‘পেট্রলবোমা নির্ভর’ ছিল, যাতে সহিংসতা ছিল ভয়াবহ ধরনের কিন্তু জনগণের অংশগ্রহণ ছিল না।

২০১৫ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বছর পূর্তি উপলক্ষে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী ‘অনির্দিষ্টকালের’ জন্য হরতাল-অবরোধের ডাক দেয়। একটানা তিন মাস চলে তাদের কর্মসূচি। হরতালে জনগণ সাড়া দেয়নি। জনজীবন স্বাভাবিক থাকে। প্রথমদিকে বোমাবাজির কারণে প্রচুর যানবাহনের ক্ষতি হয়। শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার সময়েও হরতাল প্রত্যাহারে খালেদা জিয়াকে সম্মত করানো যায়নি। মহান একুশে ফেব্রুয়ারির দিনেও হরতাল ছিল। মহান স্বাধীনতা দিবসেও হরতাল। কিন্তু এ আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছিল।

বিএনপি ও তার সহযোগীরা কি আওয়ামী লীগ যেভাবে ১৯৯৬ ও ২০০৬ সালে আন্দোলন গড়ে তুলতে পেরেছিল, তেমনটি পারবে? নাকি তাদের আন্দোলন ২০১২-২০১৫ সময়ের মতো ব্যর্থ হবে? বিএনপি মহাসচিব বলছেন, বর্তমান সার্চ কমিটি নিয়ে তারা কোনো মতামত দেবেন না। তাদের চাই নির্বাচনকালীন সরকার। এ সরকার কি অধ্যাপক ইয়াউদ্দিন আহমদের মতো সরকার হবে?

তারা সার্চ কমিটি গঠনকে অপ্রয়োজনীয় মনে করছেন। একইসঙ্গে বলছেন, সার্চ কমিটি যাদের নিয়ে গঠিত হয়েছে, তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত। চরমোনাইয়ের পীর বলেছেন, সার্চ কমিটির অধিকাংশ সদস্য নিরপেক্ষ নন।

পড়ুনঃ-  আরেকটি যুদ্ধের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হবে: ফখরুল

যে কমিটির প্রয়োজন নেই, তার সদস্যরা কে কতটা আওয়ামী লীগের অনুগত সেটা নিয়ে বিএনপির মাথাব্যথার কারণ বোধগম্য নয়। তারা এক দফার আন্দোলন গড়ে তুলতে চাইছেন, সেটা নিয়ে থাকলেই কি ভালো হয় না? বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সামরিক সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এইচ এম এরশাদও এ ধরনের অগণতান্ত্রিক সরকার গঠন করেছিলেন। তারা নির্বাচন কমিশন গঠন করেছিলেন। নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় নিরপেক্ষ প্রশাসনের দাবি তারা মানেননি। এখন বিএনপি নিজেই সেটা চাইছে।

আওয়ামী লীগ ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠান করতে পারেনি। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনেও অনেক গলদ রয়েছে। এ দলের অনেক নেতা-কর্মীর এখন ভোটারদের মুখোমুখি হতে দারুণ অনীহা। তারা চায় প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী প্রতিপক্ষকে ঠান্ডা রাখুক। এতে তাদের খালি মাঠে গোল দিতে সুবিধা। বর্তমান সরকারের আমলে স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে অনেক ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার অর্থ বণ্টন করা হয়। বিনামূল্যে কিংবা ১০ টাকা কেজি দরে লাখ লাখ পরিবারের মধ্যে নিয়মিত খাদ্য বিতরণ করা হয়।

এ ছাড়াও আছে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, স্বামী পরিত্যক্তদের ভাতাসহ অনেক ধরনের কর্মসূচি। রমজান মাসে লাখ লাখ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওযা হয়। করোনাকালে ৫০ লাখ পরিবারকে ২ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ সব কর্মসূচির সুফলভোগীদের তালিকা প্রণয়নের দায়িত্ব থাকে জনপ্রতিনিধিদের হাতে। কিন্তু অনেক স্থানেই দেখা যায় জনপ্রতিনিধিরা ‘বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত। এমনটি হতে পারে যদি কেউ এমন জনপ্রিয় হন, যার বিরুদ্ধে প্রার্থী হলে নিশ্চিত পরাজয় জেনে কেউ নির্বাচনে উৎসাহী হন না। বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। এভাবে নির্বাচিতরা সরকারের ত্রাণ সহায়তা যারা পাবেন তাদের তালিকা করতে গিয়ে বিস্তর অনিয়ম করা হয়।

পড়ুনঃ-  রাষ্ট্রপতিকে ইসি গঠনে আওয়ামী লীগের ৪ প্রস্তাব

আওয়ামী লীগ এ ‘গ্যাঁড়াকল’ থেকে কীভাবে মুক্ত হবে, সেটা কিন্তু মিলিয়ন ডলার কোশ্চেন। অন্যদিকে বিএনপির জন্যও আওয়ামী লীগের পছন্দমতো নির্বাচন কমিশন গঠন ও সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ‘গ্যাঁড়াকল’ থেকে মুক্ত হওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। তারা সরকার উৎখাত করতে চায়। এ জন্য জনগণকে রাজপথে নামতে বলে। কিন্তু তাতে সাড়া মেলে না। এ কারণে তারা ভরসা করে আছে, ‘বিদেশিরা’ যদি কিছু করে দেয়’। তাদের দলের প্রধান দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত। ভারপ্রাপ্ত প্রধান যাকে করা হয়েছে তিনিও দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত এবং দেশের বাইরে ১৪ বছরের বেশি সময় অবস্থান করছেন।

রামায়নের রাম ১৪ বছর বনবাসে ছিলেন। তিনি বিজয়ীর বেশে ফিরে এসে রাজকার্য শুরু করেছিলেন। বিএনপি কি তেমনটি আশা করছে? বিএনপির গঠনতন্ত্রে একটি ধারা ছিল এভাবে, দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত কেউ দলের পদে থাকতে পারবে না এবং জাতীয় বা স্থানীয় কোনো পর্যায়ের নির্বাচনে মনোনয়ন পাবে না। এখন বিএনপির দুই শীর্ষ নেতাই দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত। বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব গঠনতন্ত্র থেকে চুপিসারে এ ধারাটি তুলে দিয়েছে। এমন একটি দল বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করবে এবং দুর্নীতির অবসানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, সে ভরসা অনেকেই রাখতে পারছেন না।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের বর্তমান ধারা অব্যাহত রেখেই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ধারায় বাংলাদেশকে নিয়ে যাওয়া। এ জন্য দলের সর্ব পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বাংলাদেশের পথে-প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়তে হবে, যেমনটি করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের সারিতে নিয়ে যেতে নিরলস কাজ করে চলেছেন। জনগণ এটা দেখতে পারছে এবং তার প্রশংসা করছে। আওয়ামী লীগের জন্য এটা বড় অ্যাসেট। কিন্তু এটাও সত্য যে দলটির নানা পর্যায়ে যুক্তদের একটি অংশের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা কমে আসছে। এর অবসান ঘটানো কি সম্ভব?
লেখক- বীর মুক্তিযোদ্ধা ও একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক। #সময় নিউজ