নিজেদের চাহিদাই মেটাতে পারছে না কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র!

নিজেদের চাহিদাই মেটাতে পারছে না কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র!

উৎপাদনের ক্ষেত্রে সাধারণত নিজেদের প্রাথমিক ব্যবহার বাদ দিয়ে বাকিটা গ্রিডে সরবরাহ করে বিদ্যুৎকেন্দ্র। কয়েকটি কেন্দ্রের খোঁজ পাওয়া গেলো, যারা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে নিজেদের প্রয়োজনই মেটাতে পারছে না। নামমাত্র উৎপাদন করেও বসে বসে নিচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ। এতে করে বেড়ে যাচ্ছে খরচ, বেড়ে যাচ্ছে ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম

একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বছরে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করলো তার ভিত্তিতে কেন্দ্রটির ‘প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর’ নির্ধারণ হয়। ৮৯ ভাগ প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর ধরে পিডিবির সঙ্গে চুক্তি করে ওরা। কিন্তু দেশের প্রায় এক ডজন বিদ্যুৎকেন্দ্রের বার্ষিক প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর দেখে প্রশ্ন উঠতে পারে এগুলো নির্মাণ করা হলো কেন?

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেন্দ্র নির্মাণের আগেই একটি সম্ভাব্যতা জরিপ হয়। ওই জরিপে কেন্দ্রটি কেন নির্মাণ করা প্রয়োজন তা তুলে ধরা হয়। কোনও বিদ্যুৎকেন্দ্র যদি মাত্র শূন্য দশমিক চার ভাগ কিংবা শূন্য ভাগ প্ল্যান্ট ফ্যাক্টরে চলে, তখনই প্রশ্ন ওঠে কেন্দ্র নির্মাণের সম্ভাব্যতা জরিপটি আদৌ ঠিকঠাক ছিল কিনা।

পড়ুনঃ-  হ্যাটট্রিক গড়লেন অপ্রতিরোধ্য আইভী

কেউ কেউ বলছেন, প্রয়োজন ছাড়াই কেন্দ্রগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। যার দীর্ঘমেয়াদি খেসারত দিচ্ছে সরকার। প্রতি বছর এসব কেন্দ্র বসিয়ে রেখেও অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতি ইউনিট উৎপাদনের সঙ্গে একটি ক্যাপাসিটি পেমেন্ট রয়েছে। কিন্তু এমন যদি হয়, কোনও কেন্দ্র বছরে এক ইউনিটও উৎপাদন করেনি, তখন স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে।

পিডিবির তালিকায় এমন ১২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র খুঁজে পাওয়া গেছে যাদের বার্ষিক প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর ৫-এর নিচে। এর মধ্যে আছে ঘোড়াশাল ইউনিট ১ ও ২। এর মধ্যে ইউনিট ১-এর ফ্যাক্টর ১ দশমিক ৮ ও ইউনিট ২-এর ২ দশমিক ৩। হাটহাজারি ১০০ মেগাওয়াটের প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর মাত্র শূন্য দশমিক ১। কেন্দ্রটির উৎপাদনে এসেছে মাইনাস ফিগার। গেল বছর কেন্দ্রটি গ্রিড থেকে ৮ হাজার ৫৬৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিয়ে উল্টো নিজেদের চাহিদা মিটিয়েছে।

দেশে তীব্র সংকট হবে এমন আশঙ্কা জাগিয়ে বাগেরহাটের মধুমতিতে যে কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে সেটির ফ্যাক্টর মাত্র ১ দশমিক ৫। সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ সংকট হতে পারে বলে যে পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হয়েছিল তার মধ্যে গোপালগঞ্জের কেন্দ্রটির প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর শূন্য দশমিক ৭। শাহাজিবাহার ১০০ মেগাওয়টের ৫ দশমিক ২, ফরিদপুর ৫০ মেগাওয়াটের ৩ দশমিক ৭, বেড়া-৭০ মেগাওয়াটের ৫ দশমিক ২, সৈয়দপুর ২০ মেগাওয়াটের ১ দশমিক ৩, রংপুর-২০ মেগাওয়াটের শূন্য দশমিক ৯।

পড়ুনঃ-  বাতিল হচ্ছে বুকিং,আবারও ধস কুয়াকাটার হোটেল ব্যবসায়

বেসরকারিখাতেও এমন তিনটি অলস কেন্দ্র রয়েছে। এগুলো হচ্ছে কেরানীগঞ্জের সিএলসি পাওয়ার ১০৮ মেগাওয়াট। পিডিবি বলছে, কেন্দ্রটির প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর গত বছর ছিল শূন্য। সিনহা পাওয়ারের ৫২ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটির ফ্যাক্টর ৫, আর খুলনার লবনচোরাতে ওরিয়ন পাওয়ারের ১০৫ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটির ফ্যাক্টর শূন্য দশমিক ৪।

বিষয়টি কীভাবে দেখছেন জানতে চাইলে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, সরকার বলছে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ২১ হাজার মেগাওয়াট। এখন যে চাহিদা তাতে বহু কেন্দ্র বসে থাকে। আবারও মেগা প্রজেক্টের নামে আরও বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হচ্ছে। এতে আরও কেন্দ্র বসে থাকবে সামনের দিনগুলোতে।

তিনি বলেন, সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনে চুরির সুযোগ কম, কেন্দ্রে চুরির সুযোগ বেশি। এসবের মাধ্যমে সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এদিকে প্রতি বছর নানা অজুহাতে বাড়ানো হচ্ছে বিদ্যুতের দাম।

পড়ুনঃ-  চারঘাটে খোকন হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেফতারের দাবিতে ঝাড়ু মিছিল ও মানববন্ধন

এদিকে বাগেরহাটের মধুমতি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির সিইও প্রকৌশলী এ এম খোরশেদুল আলম বলেন, আমাদের কেন্দ্রটি করা হয়েছিল সর্বোচ্চ চাহিদার সময় ব্যবহারের জন্য। এটি সাধারণত ফেব্রুয়ারি মাসে চালানো হয়। তবে কেন্দ্রটির মূল সমস্যা সঞ্চালন লাইন। লাইনটি ঠিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঠিক হলে আরও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন বলেন, এটা আসলে ভুল পরিকল্পনার মাশুল। কেন্দ্রগুলোর এখন অবসরে যাওয়া উচিত। এভাবে বসিয়ে টাকা দেওয়ার কী মানে। তিনি বলেন, বিদ্যুতের দাম যে বাড়ে সেটার একটা বড় কারণ ওভার ক্যাপাসিটি। সামনে আরও বড় বড় কেন্দ্র আসছে। সেগুলোর চাপে ছোট কেন্দ্র বসে যাবে। প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর বিবেচনায় কেন্দ্রগুলোর বিষয়ে এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি বলে তিনি মনে করেন। #বাংলা ট্রিবিউন